দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনসহ দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জামায়াত নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়।’
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে এসব কথা বলেন তিনি।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি আলাদা অবস্থান নিয়েছিলেন। তখনই তিনি বলেছিলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।’
পদত্যাগের কারণ হিসেবে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন সামান্তা শারমিন। চারটি বিষয় হলো:
জামায়াত সংস্কারের মিত্র নয়
সামান্তা শারমিনের মতে, এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না।
তিনি বলেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। দলটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক নয়। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই জামায়াত সংস্কারের কথা বলে।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, জামায়াতকে সংস্কারের বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ এনসিপির সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপিকে জামায়াতের সহায়ক ভূমিকায় যেতে হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
নির্বাচনে বড় দলের লেজুড় হওয়া
২০২৬ সালের নির্বাচনকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নির্বাচন হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, এনসিপির সামনে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করতে চাওয়া শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে রাজনৈতিক নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল।
কিন্তু এনসিপি সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি। বরং বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটির নিজস্ব রাজনীতি এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নষ্ট করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তা শারমিন জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে বলেছিলেন। তবে দল সে পথে হাঁটেনি।
তার মতে, রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে নির্বাচনী জয়কে প্রাধান্য দেওয়ায় সংস্কারবিহীন ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়েছে এনসিপি।
নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে ন্যূনতম পাঁচশ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে এককভাবে নতুন ধরনের নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন। অথচ বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে তার মৃত্যুর ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা সামান্তা শারমিনের মতে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অধিকার ও মর্যাদা উপেক্ষা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সামান্তা শারমিনের মতে, নারীরা শুধু আন্দোলনে অংশ নেননি, বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং সম্মুখসারিতে থেকে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছেন।
তবে বিজয়ের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও দল তা কাজে লাগায়নি।
তার অভিযোগ, এনসিপি নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করলেও নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করেনি। বরং নারীদের প্রতিবাদ যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
সামান্তা শারমিন বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।
তিনি আরও বলেন, নারীদের শুধু সমান সুযোগ দিলেই হবে না; ঐতিহাসিক বৈষম্য কাটাতে তাদের অধিক প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে এবং এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে।
কাউন্সিল ছাড়াই দলের পুনর্গঠন
এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করেছিল, যার কাঠামো হবে প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে আলাদা। সেই নতুনত্বের প্রতিফলন দলের আর্থিক স্বচ্ছতা ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চায়ও থাকার কথা ছিল।
তিনি বলেন, দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন। কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো বিরোধী মত দমনের প্রবণতা অনুসরণ করেছে এনসিপি।
সামান্তা শারমিনের মতে, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই এ ধরনের বড় রদবদল অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতা স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবিতে দলটির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানোর পরও এনসিপি গতিপথ পরিবর্তনে আগ্রহী না হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করছেন।
পদত্যাগের পর নিজের রাজনৈতিক অভিমুখ তুলে ধরে তিনি বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান জানান। তার মতে, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জনগণের স্বার্থ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে হবে দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা বিরাগের ভিত্তিতে নয়।
বিবৃতির শেষাংশে সামান্তা শারমিন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে কাজ করতে আগ্রহীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে চান।
/অ